চার লেনের মহাসড়কেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬

মাঝসড়কে যাত্রী ওঠানামা, উল্টো পথে অটোরিকশা, অবৈধ পার্কিং ও খানাখন্দে নিত্য দুর্ভোগে পড়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের যাতায়াত এবং গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের শত শত কারখানার কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনের প্রধান ভরসা এই মহাসড়ক। চার লেনে উন্নীত করা হলেও যানজটের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মেলেনি। বরং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণহীন ছোট যানবাহন, মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এবং আইন প্রয়োগের ঘাটতিতে প্রতিদিন অসহনীয় ভোগান্তিতে পড়ছেন মানুষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, গাজীপুরের জৈনা বাজার, এমসি বাজার, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, বাঘের বাজার, ভবানীপুর এবং দেশের অন্যতম ব্যস্ত চারমুখী সংযোগস্থল মাওনা চৌরাস্তা এখন প্রায় স্থায়ী যানজটের এলাকায় পরিণত হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব স্থানে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যায়। ব্যস্ত সময়ে মহাসড়কের চারটি লেনই গাড়িতে পূর্ণ হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় আটকে থাকতে হয় যাত্রীদের।

অফিসগামী মানুষ, শিল্পকারখানার শ্রমিক, শিক্ষার্থী, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ও দূরপাল্লার যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। যানজটে আটকে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে জ্বালানি খরচ, ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার পণ্য পরিবহন।

ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এলাকা জৈনা বাজার। এখানে প্রতিদিন শত শত অটোরিকশা, সিএনজি ও অন্যান্য ছোট যানবাহন চলাচল করে। বিশেষ করে অফিস শুরু ও শেষের সময়ে অনেক অটো রিকশা ও যানবাহন উল্টো পথে চলাচল করে। এতে একদিকে যানজট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়ম ভেঙে উল্টো পথে চলাচল অনেকটা প্রকাশ্যে হলেও তা বন্ধে নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারি দেখা যায় না।

দীর্ঘদিন ধরে এমসি বাজার মহাসড়কের অন্যতম ভোগান্তিপূর্ণ এলাকা। এখানে লোকাল বাস, মিনিবাস ও অন্যান্য যাত্রীবাহী যানবাহন মহাসড়কের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করায়। একটি বাস কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই পেছনের শত শত যানবাহনের চলাচল আটকে যায়। ওভারটেকের সুযোগ না থাকায় মুহূর্তেই দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।

নির্ধারিত বাসস্টপ থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় প্রতিদিন একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। একটি গাড়ির সাময়িক দাঁড়িয়ে থাকাই কখনো কখনো কয়েক কিলোমিটার যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

মাওনা চৌরাস্তা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চারমুখী সংযোগস্থল। এখান থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ, শ্রীপুর ও কালিয়াকৈরমুখী যানবাহন চলাচল করে। ফলে এই এলাকায় সামান্য বিশৃঙ্খলাও দ্রুত বড় যানজটে রূপ নেয়।

উড়ালসেতুর দুই পাশে বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করে। নিচের অংশে রয়েছে কাঁচাবাজারের বড় আড়ত। সেখানে পণ্য সরবরাহের জন্য ভ্যান ও রিকশা অনেক সময় উল্টো পথে প্রবেশ করে। অন্যদিকে শ্রীপুর ও ফুলবাড়িয়ামুখী সংযোগ সড়কেও অটোরিকশার দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। এসব ছোট ছোট জট একসময় একত্র হয়ে পুরো চৌরাস্তা ও মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি করে।

মাওনা চৌরাস্তার কাঁচাবাজারের আশপাশে ইউটার্ন না থাকায় পিকআপ ভ্যানসহ পণ্যবাহী বিভিন্ন যানবাহন বাধ্য হয়ে উল্টো পথে প্রবেশ করে। এতে মূল সড়কের যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং সহজেই তৈরি হয় যানজট।

মাওনা চৌরাস্তা থেকে শ্রীপুর উপজেলা এবং কালিয়াকৈরের ফুলবাড়িয়ামুখী সড়কেও দিনের ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের চাপ বাড়ে। সংযোগ সড়কে অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনের বিশৃঙ্খল চলাচল মূল মহাসড়কের গতিও কমিয়ে দেয়।

যানজটের পাশাপাশি মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত ও খানাখন্দও নতুন করে ভোগান্তি বাড়িয়েছে। বৃষ্টির সময় এসব গর্তে পানি জমে থাকায় চালকেরা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বুঝতে পারেন না। গর্ত এড়াতে দ্রুতগতির যানবাহন হঠাৎ গতি কমায় কিংবা লেন পরিবর্তন করে। এতে স্বাভাবিক যানপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

বিশেষ করে এমসি বাজার এলাকায় সড়কের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যানবাহনকে এক লেনে চলতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। এতে সাময়িক যানজট আরও তীব্র হচ্ছে।

আরেকটি বড় সমস্যা অবৈধ পার্কিং। মহাসড়কের আশপাশে অসংখ্য শিল্পকারখানার নিজস্ব পার্কিং এলাকা থাকলেও অনেক ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহন মহাসড়কের কাঁধ ও লেন দখল করে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকে।

একটি কাভার্ড ভ্যান রাস্তার একটি অংশ দখল করে রাখলেও ব্যস্ত সময়ে এর প্রভাব পড়ে পুরো যানপ্রবাহে। অন্য যানবাহনকে কম জায়গায় চলাচল করতে হয়। একপর্যায়ে সেই সংকুচিত জায়গায় যানবাহনের চাপ বেড়ে গিয়ে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যানবাহন সরিয়ে দেওয়া হলেও স্থায়ীভাবে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

মাওনা হাইওয়ে থানার ওসি কামরুজ্জামান বলেন, হাইওয়ে পুলিশের একটি দল মহাসড়কে চলমানভাবে দায়িত্ব পালন করে এবং আরেকটি দল মাওনা চৌরাস্তার কাটার এলাকায় দায়িত্ব পালন করে। পুলিশ দায়িত্ব পালনকালে অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। তবে পুলিশ চলে গেলে আবার মহাসড়কের মাঝখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা শুরু হয় বলে জানান তিনি।

পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইন মানার প্রবণতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক চালককে কোনোভাবেই নিয়ম মানানো সম্ভব হচ্ছে না। গাড়ি রাস্তার পাশে রেখে যাত্রী ওঠানামা করার নিয়ম থাকলেও অনেকে রাস্তার মাঝখানেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেন।

গাজীপুর জেলা ট্রাফিক পুলিশের টিআই (অ্যাডমিন) হামিদুর রহমান বলেন, মহাসড়কে ফুটপাত নির্মাণের কারণে শুরুতে কিছুটা অসুবিধা হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো।

গাজীপুর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বলেন, বাজার এলাকায় যানজটের একাধিক কারণ রয়েছে। বাজার ও ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো ফুটপাত দখল করে নেওয়ায় সড়কের ওপর চাপ বাড়ছে।

বর্তমানে রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে। আশা করা যাচ্ছে, খুব শিগগিরই সব কাজ শেষ হবে। কাজ শেষ হলে যানজট আরও কমে যাবে এবং সাধারণ মানুষের চলাচল আরও সহজ, নিরাপদ ও স্বাভাবিক হবে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলা হলেও মহাসড়ক ব্যবহারকারী মানুষের অভিজ্ঞতা অনেকটাই ভিন্ন। ব্যস্ত সময়ে এখনো বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘ যানজট দেখা যাচ্ছে। কোথাও বাস মাঝসড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে, কোথাও কাভার্ড ভ্যান সড়কের অংশ দখল করে আছে, কোথাও অটোরিকশা উল্টো পথে ঢুকে পড়ছে। আবার কোথাও সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের কারণে যানবাহনকে এক লেনে নামতে হচ্ছে।

ফলে যানজটের একটি কারণ সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে এলেও অন্য কোনো কারণে আবার নতুন করে সমস্যা তৈরি করছে। পুলিশ যানজট সরিয়ে দেওয়ার পর কিছুক্ষণ পরই একই স্থানে আবার যানজট তৈরি হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের।

চার লেনে উন্নীত করার পর এই মহাসড়কে যানবাহনের গতি বাড়ার কথা ছিল। কমার কথা ছিল যাতায়াতের সময়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে মানুষকে।

একজন যাত্রীর এক ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা মানে শুধু এক ঘণ্টা সময়ের অপচয় নয়। শিল্পকারখানার শ্রমিকের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, পণ্যবাহী গাড়ি আটকে থাকায় বাড়ছে পরিবহন ব্যয়, অপচয় হচ্ছে জ্বালানি। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে। দীর্ঘ যানজটে আটকে গেলে জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ও হারিয়ে যেতে পারে।

যানজট তৈরির পেছনে রয়েছে মানুষের তৈরি একাধিক কারণ—মাঝসড়কে যাত্রী ওঠানামা, অবৈধ পার্কিং, উল্টো পথে ছোট যানবাহন, বাজার ও ফুটপাত দখল এবং সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ