ক্যানুলা ও নাকে নল নিয়ে হাসপাতালে লড়ছে হাজারও শিশু

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা অটোচালক আবু সাইদের সাত মাস বয়সী একমাত্র সন্তান ইউসুব। নিউমোনিয়া নিয়ে ২৪ দিন আগে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিল সে। নিউমোনিয়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার মুহূর্তেই গত মঙ্গলবার হাসপাতালেই তার শরীরে হাম ধরা পড়ে।

এর পর থেকেই সাইদ-মৌসুমি দম্পতির কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। হাম ধরা পড়ার পর থেকে ইউসুব ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। মাথায় ক্যানুলা, এক নাকে অক্সিজেনের পাইপ, অন্য নাক দিয়ে নলের মাধ্যমে চলছে খাবার গ্রহণ। হাত-পাসহ পুরো শরীর হামের লাল র‍্যাশে ভরে গেছে। ছেলের শিয়রে বসে অঝোরে কাঁদছেন মা মৌসুমি। কিছুক্ষণ আগেই চিকিৎসক জানিয়ে গেছেন, ইউসুবের শ্বাসকষ্ট ও অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় সে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না, তার জরুরি আইসিইউ প্রয়োজন।

কিন্তু আইসিইউ’র জন্য বাবা আবু সাইদ দৌড়ঝাঁপ করে দেখলেন, সিরিয়াল অনেক দূরে। আগামী দুই-তিন দিনেও আইসিইউ পাওয়া সম্ভব নয়। কান্না করতে করতে স্ত্রীর পাশে এসে বসলেন সাইদ। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে অঝোরে জল ফেলছেন। এদিকে, ইউসুবের শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হওয়ায় সে কান্নার চেষ্টা করছে, কিন্তু শরীর এতটাই দুর্বল যে সেই সামর্থ্যটুকুও তার নেই।

স্বজন হারানোর বেদনা ও আইসিইউ সংকট

একটু সামনে এগোতেই দুই মাস বয়সী আয়মানের কান্নায় যেন পুরো ওয়ার্ড ভারী হয়ে ওঠে। আয়মানের হাতেও ক্যানুলা, নাকে নল ও অক্সিজেনের পাইপ। মা জান্নাত আরা বেগম ছেলেকে বুকের ভেতর জড়িয়ে আগলে রেখে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, মুখের ভেতরেও ঘা হওয়ায় কিছুই খাওয়াতে পারছি না। পেটে সবসময় খিদে থাকে, শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। আর যে হাতে ক্যানুলা লাগানো, সে হাতে একটু নাড়া লাগলেই চিৎকার করে ওঠে।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিত্র

১০০ শয্যার এই হাসপাতালে হামের জন্য মাত্র আটটি বেড বরাদ্দ থাকলেও এখন চিকেনপক্স ও নিউমোনিয়া ওয়ার্ডের বেড যুক্ত করে পঞ্চম তলার পুরোটাই হামের ওয়ার্ড করা হয়েছে। কিন্তু রোগীর চাপের তুলনায় তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। বেডের চেয়ে তিনগুণ বেশি রোগী আসায় চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।

হাসপাতালগুলোর সার্বিক অবস্থা

গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর এই দুটি হাসপাতাল সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, হামের ওয়ার্ডের প্রতিটি শিশু ক্যানুলা ও নাকে প্রবেশ করানো নলের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। অভিভাবকদের চোখেমুখে শুধুই উৎকণ্ঠা। বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালে ৬০টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিনই ৭৫-এর অধিক শিশু ভর্তি থাকে।

শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, তাদের ১৪টি আইসিইউ বেডের সবকটিতেই রোগী রয়েছে। নতুন কোনো গুরুতর রোগী এই মুহূর্তে ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অনেক শিশুর আইসিইউ প্রয়োজন হলেও তা দেওয়া যাচ্ছে না। একটি আইসিইউ বেডের বিপরীতে একাধিক রোগীর সিরিয়াল রয়েছে।

নাকে নল দিয়ে খাবার দেওয়ার বিষয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, ‘যাদের তীব্র শ্বাসকষ্ট, তাদের আমরা নাকে নল দিয়ে খাবার দেই। কারণ, এই অবস্থায় মুখে খাবার দিলে তা শ্বাসনালীতে গিয়ে মৃত্যুঝুঁকি অনেকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়।’

সারাদেশে মৃত্যু ও আক্রান্তের পরিসংখ্যান

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে নিশ্চিতভাবে হামে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে, হামের লক্ষণযুক্ত বা সন্দেহজনক হিসেবে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৫৬ জন শিশুর। অর্থাৎ, গত এক মাসে দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ১৮৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারাদেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৭২১ জন এবং সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ৯৫৪ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় ঢাকা বিভাগ শীর্ষে, এর পরেই রয়েছে রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগ।

সরকারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি

দেশব্যাপী হাম ছড়িয়ে পড়ায় সরকার টিকা গ্রহণের সময় কমিয়ে নয় মাসের স্থলে ছয় মাসে এনে গত ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে। সংক্রমণের হার বিবেচনায় ১৮ জেলার ৩০ উপজেলার ১২ লাখ শিশুকে এই টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৭৮ লাখ ৪০ হাজার শিশুর মাঝে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হবে, যার মাধ্যমে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ