সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২২ শিশুর মৃত্যু : হাম নয়, নেপথ্যে ‘সহ-রোগ’

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬

হাম কি শুধুই একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ, নাকি বড় কোনো বিপদের আগাম বার্তা? রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের (আইডিএইচ) বর্তমান চিত্র বলছে এক ভয়াবহ আশঙ্কার কথা। গত তিন মাসে হাসপাতালটিতে ২২টি শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে, তবে এর নেপথ্যে শুধু ‘হাম’ নয়, বরং ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিভিন্ন জটিল ‘সহ-রোগ’ বা কো-মরবিডিটি।

মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গত তিন মাসে ২২ শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ শুধু হাম নয়। চিকিৎসকদের মতে, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও জন্মগত হৃদরোগের মতো ‘সহ-রোগ’ যুক্ত হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে ৩ থেকে ১০ মাস বয়সী শিশুরা, যারা এখনো টিকার আওতায় আসেনি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে

সোমবার (৩০ মার্চ) হাসপাতালটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হামের রোগীর প্রচণ্ড চাপে চিকেন পক্স ও নিউমোনিয়ার জন্য বরাদ্দ দেওয়া ওয়ার্ডেও হামের রোগীদের রাখা হয়েছে। এতে একে অন্যের মাধ্যমে নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হামের রোগীদের জন্য মাত্র আটটি শয্যা বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। শয্যা না থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

dhakapost

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ৮৬ জন হামের রোগী ভর্তি আছেন, যার মধ্যে ১২ জন আইসিইউতে। গত জানুয়ারি মাসে ২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল। তবে, ফেব্রুয়ারিতে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৮ জনে। চলতি মার্চের ৩০ তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছেন ৪৫৫ জন। জানুয়ারি মাসে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে একজন এবং মার্চ মাসে এখন পর্যন্ত ২২ জন মারা গেছে।

হাসপাতালটির জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. শ্রীবাস পাল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘গত তিন মাসে আমাদের এখানে যে ২২টি শিশু মারা গেছে, তাদের অধিকাংশের বয়স ৩ থেকে ১০ মাসের মধ্যে। এই বয়সের শিশুরা হামের কোনো টিকা না পাওয়ায় তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আমাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃত শিশুদের প্রায় সবারই হামের সঙ্গে গুরুতর নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা চোখের প্রদাহ ছিল। অনেকেরই আগে থেকে হৃদরোগ বা কিডনি জটিলতা ছিল। শুধু হামের কারণে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়েছে— এমন রোগী আমরা পাইনি।’

হাসপাতালটিতে হামের রোগীর প্রচণ্ড চাপে তিল ধারণের জায়গা নেই। মাত্র আটটি বরাদ্দ দেওয়া শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ৮৬ জন রোগী ভর্তি আছেন। শয্যা না থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া একই ওয়ার্ডে হাম, চিকেন পক্স ও নিউমোনিয়া রোগীদের একত্রে রাখায় একে অন্যের মাধ্যমে নতুন সংক্রমণের চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে

হামের লক্ষণ সম্পর্কে ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, “প্রথম তিন-চার দিন জ্বর, শরীর ব্যথা, সর্দি ও কাশির মতো সাধারণ উপসর্গ থাকে। এরপর চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দানা বা র‍্যাশ দেখা দেয়। বিশেষ করে মুখের ভেতরে ‘কপলিক স্পট’ দেখে হাম শনাক্ত করা যায়।”

dhakapost

তিনি সতর্ক করে বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে। শরীরে র‍্যাশ বের হওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকেই শিশুটি হাম ছড়াতে থাকে, যা নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন।

হাম-পক্সের সহাবস্থান : বাড়ছে নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি

এদিকে, হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে পক্স, নিউমোনিয়া ও হামের রোগীদের একত্রে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। একাধিক সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের একই স্থানে রেখে চিকিৎসা দেওয়ায় প্রত্যেকেই চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এ বিষয়ে ওই ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘আমাদের আসলে কিছু করার নেই। কক্ষটি অন্যান্য সংক্রামক রোগীর জন্য বরাদ্দ থাকলেও বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে হামে আক্রান্ত রোগীদের যেভাবে এখানে পাঠানো হচ্ছে, তাতে বাধ্য হয়েই সবাইকে একত্রে রাখতে হচ্ছে। হামে আক্রান্ত রোগীদের আসামাত্রই অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে, তাই জীবন বাঁচাতে দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।’

হামের সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী হার বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ) জরুরি সভা করেছে। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, নিয়মিত কর্মসূচির পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ছয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হবে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ৪৫৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যার মধ্যে ১২ জন আইসিইউতে আছেন

গাজীপুরের টঙ্গী থেকে পাঁচ মাস বয়সী মিনহাজকে নিয়ে গত রাতেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মা মনি আক্তার। হাসপাতালে কোনো শয্যা (বেড) খালি না থাকায় বাধ্য হয়ে অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে মেঝেতেই আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। মনি আক্তার জানান, গত চার দিন ধরে তীব্র জ্বরের পাশাপাশি মিনহাজের মুখে হালকা লাল দাগ দেখা দেয়। প্রথমে অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ানো হলেও পরে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসেন তিনি। কিন্তু মেঝেতে ধুলোবালি আর মানুষের চলাচলের কারণে অসুস্থ শিশুটির অবর্ণনীয় কষ্ট হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ