দাভোস যখন ধনকুবেরদের আড্ডাখানা, ট্রাম্প তখন সাধারণ মানুষের ত্রাণকর্তা?

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬

সুইজারল্যান্ডের বিলাসবহুল পাহাড়ি শহর দাভোসে অবকাশ যাপনের জন্য একটি সাধারণ কাঠের বাড়ির (শ্যালেট) দামই প্রায় ৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার। মার্কিনিদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা আরও সাশ্রয়ী করার প্রতিশ্রুতি দিতে এই অদ্ভুত জায়গাটিকেই বেছে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) দাভোস সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর পূর্তিতে ট্রাম্প দাভোসে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এর সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। এই সম্মেলনটি ‘দাভোস সম্মেলন’ নামে বিশ্বব্যাপী অভিজাত ও ধনকুবেরদের বার্ষিক মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর গত এক বছরে ট্রাম্পের পাশে যেসব বিলিয়নেয়ারদের দেখা গেছে, দাভোস সম্মেলনে তাঁদের অনেকের সঙ্গেই ট্রাম্পের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রাম্পের মনোযোগ বিদেশি নীতির দিকেই বেশি
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি বা ‘পপুলিস্ট’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। এমনকি সাধারণ ভোটারদের মন জয় করতে ম্যাকডোনাল্ডসের ড্রাইভ-থ্রুতে দাঁড়িয়ে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইও পরিবেশন করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তাঁর কার্যক্রম বলছে ভিন্ন কথা। শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে তিনি এখন ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সময় কাটাতে এবং আনন্দ-উল্লাস করতেই বেশি ব্যস্ত। লিবারেল থিংক ট্যাংক ‘গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভ’-এর নীতি ও প্রচারণা বিষয়ের কর্তাব্যক্তি অ্যালেক্স জ্যাকুয়েজ বলেন, ‘দিনের শেষে দাভোসের বিনিয়োগকারী এবং বিলিয়নেয়াররাই তাঁর মনোযোগের কেন্দ্রে থাকেন। সেইসব পরিবারকে তাঁর আশপাশে দেখা যায় না, যারা বিল পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে।’
বর্তমানে ট্রাম্পের মনোযোগ বিদেশি নীতির দিকেই বেশি। বিশেষ করে গাজা, ইউক্রেন এবং ভেনেজুয়েলা সংকট। এছাড়া তিনি ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনার জেদ ধরে বসে আছেন। এতে ইউরোপীয় মিত্ররা তাঁর ওপর বেশ বিরক্ত। দাভোসেও তাঁর আবাসনের পরিকল্পনার চেয়ে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটিই বেশি প্রাধান্য পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জরিপ কী বলছে
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এনওআরসি সেন্টারের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানের মধ্যে ৬ জনই মনে করেন ট্রাম্প জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছেন। এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও এই নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন ট্রাম্প জিনিসপত্রের দাম কমাতে ‘অনেক বেশি’ সাহায্য করেছেন, যা ২০২৪ সালের এপ্রিলের তুলনায় (৪৯ শতাংশ) অনেক কম। প্রখ্যাত রিপাবলিকান পোলস্টার ফ্রাঙ্ক লুনটজ বলেন, ‘বিলিয়নেয়াররা কি জনপ্রিয়? এর উত্তর হলো—না। ভোটাররা ট্রাম্পের বিলিয়নেয়ার বন্ধুদের সম্পর্কের চেয়ে নিজের জীবনে অর্থনীতির প্রভাব কেমন, তা নিয়েই বেশি চিন্তিত।’
ধনকুবেরদের প্রতি বিশেষ অনুরাগ
ফেডারেল রিজার্ভ বলছে, ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের পর থেকে আমেরিকার শীর্ষ শূন্য দশমিক ১ শতংশ ধনীদের সম্পদ ১১ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে। এর বিপরীতে নিচের ৫০ শতাংশ জনগণের নেট সম্পদ বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৯৪ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ শীর্ষ ধনীদের লাভের তুলনায় সাধারণ মানুষের আয় অত্যন্ত নগণ্য। আবাসন সংকট সমাধানে ট্রাম্প সম্প্রতি ২০০ বিলিয়ন ডলারের মর্টগেজ ঋণ কেনা এবং বড় আর্থিক সংস্থাগুলোর ঘরবাড়ি কেনা নিষিদ্ধ করার মতো প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সমস্যা হলো ঘরবাড়ির অপর্যাপ্ত নির্মাণ এবং মজুরির তুলনায় বাড়িঘরের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া। ট্রাম্প যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছেন তা দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান হবে না। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ড্যারেল ওয়েস্ট বলেন, ‘অতিধনীদের পছন্দ কর ছাড় এবং নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ। এই নীতিগুলোর কারণে সরকার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে সহায়তা দিতে পারে না। ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’-এর কর ছাড় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বছরে গড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ডলার সাশ্রয় করতে পারলেও শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীরা গড়ে ১৩ হাজার ৬০০ ডলার এবং কোটিপতিরা বছরে গড়ে ৬৬ হাজার ৫১০ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করবেন।
ধনীদের বলয়ে ট্রাম্প
ট্রাম্প নিয়মিত হোয়াইট হাউসে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ধনী বিল গেটস, টিম কুক ও মার্ক জাকারবার্গের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে ডিনারে বসে তিনি গর্ববোধ করেন। তাঁর প্রশাসনেও তিনি ইলন মাস্ক, হাওয়ার্ড লুটনিক এবং স্টিভ উইটকফের মতো বিলিয়নেয়ারদের উচ্চপদে বসিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই বলেন, ট্রাম্পের শিল্পপতিদের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিশ্চিত করছে, যা সাধারণ আমেরিকানদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট মনে করেন, ট্রাম্প নিজে একজন বিলিয়নেয়ার হওয়াটাই তাঁর প্লাস পয়েন্ট। তাঁর মতে, ‘জনগণ তাঁকে ভোট দিয়েছে কারণ তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী, যিনি অর্থনীতি বোঝেন এবং জানেন কীভাবে এটি ঠিক করতে হয়।’

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ