প্রবৃদ্ধি কোনো লক্ষ্য বা মিশন হতে পারে না। প্রবৃদ্ধি হলো আসল সমস্যার সমাধানে বিনিয়োগ করার ফলাফল। যেমন অর্থনীতিকে কার্বনমুক্ত করার মিশনের কথাই ধরা যাক। এটা একই সঙ্গে শক্তি, পরিবহন, খাদ্য ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে বদলে দেবে। আবার ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ মিশন লাইফ সায়েন্সের মতো খাতে উদ্ভাবনের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারে। এর মানে কোনো বিশেষ খাতকে সুবিধা দেওয়া নয়। প্রশ্নটা হলো, একটি মিশন সফল করতে কোন খাতের ভূমিকা কী হবে। এসবের জন্য নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস আর খুঁটিনাটি বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। উদ্ভাবনের যৌথ উদ্যোগগুলোকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন জনগণের টাকায় করা গবেষণা ব্যক্তি মালিকানায় চলে না যায়। ঢালাও পেটেন্ট বা লাইসেন্স পাওয়ার জটিলতা তৈরি করে এটা করা হয়। অতিরিক্ত দাম নির্ধারণও নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ অতিরিক্ত দামের কারণে মূল্যটা কোত্থেকে এল, সেই উৎসটাই আড়ালে পড়ে যায়।
যুক্তরাজ্যের ভুল থেকে শিক্ষা
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি কীভাবে করা উচিত নয়, তার আদর্শ উদাহরণ হতে পারে যুক্তরাজ্য। দেশটির ‘ব্যাবসাবান্ধব’ লেবার সরকার আবারও সেই ব্যয়বহুল ভুলের ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা বিশ্লেষণ কোম্পানি প্যালান্টিরের কথাই ধরুন। যুক্তরাজ্যের জনসেবা খাতে তারা জেঁকে বসেছে। মহামারির সময় তারা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বা এনএইচএসকে বিনামূল্যে সেবা দিয়েছিল। তাদের যুক্তরাজ্যের প্রধান একে ম্যাগাজিনের ‘ট্রায়াল সাবস্ক্রিপশন’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সেই প্যালান্টিরের হাতেই এখন এনএইচএসের ৩৩০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি মূল্যের চুক্তি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই পাওয়া ২৪০ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রতিরক্ষা চুক্তি।
সাত বছর ধরে আলোচনার পর সুইস সেনাবাহিনী প্যালান্টিরের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন যে মার্কিন মালিকানাধীন কোম্পানির হাতে তথ্য গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে। প্যালান্টিরের বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা সংকটকালে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। অথচ ২০২২ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্য এই কোম্পানির পেছনে ব্যয় তিন গুণ বাড়িয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে সরবরাহকারী বদলাতে হলে পুরো ডেটা স্থাপত্য নতুন করে সাজাতে হবে। তাতে খরচ হবে বিপুল। এমন পরিস্থিতি এড়াতে এবং জনগণের খরচ নাগালের মধ্যে রাখতে চুক্তিতেই শর্ত থাকা জরুরি। সেই শর্ত হতে হবে রাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে।
টেমস ওয়াটারের উদাহরণটাও বেশ করুণ। অস্ট্রেলিয়ান সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ম্যাককোয়ারি সেখান থেকে মুনাফা তুলে নিলেও প্রতিষ্ঠানটির ঘাড়ে ২ বিলিয়ন পাউন্ড ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। ব্ল্যাকস্টোন ও ম্যাককোয়ারির মতো কোম্পানি থেকে যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো তহবিলের বড় অংশ আসছে। এখানে একটা পরিষ্কার ছক দেখা যায়। ঝুঁকিটা সমাজের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। আর লাভের অংশটা পকেটে ভরছে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। আর্থিক কারসাজির কারণে প্রয়োজনীয় সেবাগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। গত সপ্তাহে অফশোর বায়ুশক্তির জন্য ‘ক্লিন ইন্ডাস্ট্রি বোনাস’ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ব্রিটিশ সাপ্লাই চেইনে বিনিয়োগের শর্ত রাখা হয়েছে। সরকার হয়তো কিছু শিক্ষা নিচ্ছে। তবে এই পরগাছাবৃত্তি থামানোর জন্য এসব শর্ত যথেষ্ট কি না তা সময়ই বলে দেবে।
সত্যিকারের অংশীদারত্ব বনাম ভণ্ডামি
কার্যকর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে এমন সব শর্ত থাকতে হবে যেন জনসমর্থন থেকে জনকল্যাণ নিশ্চিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’ তহবিল পাওয়ার জন্য কোম্পানিগুলোকে কিছু শর্ত দিয়েছে। তাদের শেয়ার বাইব্যাক বা নিজেদের শেয়ার নিজেরা কেনা সীমিত করতে হবে। কর্মী উন্নয়ন ও শিশুযত্নে বিনিয়োগ করতে হবে। জার্মানির সরকারি ব্যাংক কেএফডব্লিউ স্বল্প সুদে ঋণ দেয় কার্বন কমানোর লক্ষ্য পূরণের শর্তে। চিলির লিথিয়াম কৌশলেও খনি কোম্পানিগুলোকে দেশের ভেতরে মান সংযোজন এবং স্থায়িত্বের মানদণ্ড মানতে বাধ্য করা হয়। সেখানে মুনাফার উল্লেখযোগ্য অংশ রাষ্ট্র পায়।
এগুলো ব্যবস্যাবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নয়। এগুলো হলো পারস্পরিক আদান-প্রদানের কাঠামো। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত প্রণোদনার সঙ্গে জনস্বার্থের লক্ষ্য এক সুতোয় গাঁথা হয়। অক্সফোর্ড বা অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার জন্য যুক্তরাজ্য যখন ৬৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা দিয়েছিল তখন একটা শর্ত ছিল। মহামারির সময়ে কোম্পানিটি মুনাফা করতে পারবে না। এটাই হলো সত্যিকারের অংশীদারত্ব। এখানে ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া হয়। পুরস্কার ভাগ করে নেওয়া হয়। আবার উদ্দেশ্যও থাকে অভিন্ন।
প্রহসনের দাভোস নাকি কাজের মঞ্চ
এই সপ্তাহে দাভোসে যথারীতি স্টেকহোল্ডার ক্যাপিটালিজম বা টেকসই উন্নয়ন নিয়ে নানা বুলি শোনা যাবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট মেকানিজম বা ব্যবস্থা ছাড়া এগুলো নিছক নাটক। বাধ্যতামূলক শর্ত, জবাবদিহিতার কাঠামো এবং ঝুঁকির সমান ভাগ ছাড়া প্রকৃত মূল্য তৈরি করা সম্ভব নয়। ভাড়া খাটা আর মূল্য তৈরির মধ্যে তফাৎ বুঝতে হবে। লাতিন আমেরিকায় সম্পদ লুটের ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় উন্মোচিত হচ্ছে। দাভোসে উপস্থিত সবার নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত। আমরা কি সত্যিকারের অংশীদারত্ব গড়ছি নাকি সম্পদ শোষণের উন্নত কোনো ব্যবস্থা তৈরি করছি?
উত্তরটা খুবই পরিষ্কার। প্রযুক্তি জগৎ বা টেক টাইটানরা ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য দেখাতে লাইন ধরেছে। মেটার মার্ক জাকারবার্গ ফ্যাক্ট-চেকিং বা সত্য যাচাই বন্ধ করে দিয়েছেন। অ্যামাজনের জেফ বেজোস ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা হরণ করেছেন। ক্ষমতার সামনে নতজানু হয়ে তাঁরা অ্যালগরিদমের মাধ্যমে শোষণ চালিয়ে যাওয়ার অবাধ সুযোগ চান। অন্যদিকে তেল কোম্পানির কর্তারা প্রকাশ্যে ভেনেজুয়েলার রিজার্ভ ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা করছেন। আর বিশৃঙ্খল দেশটি থেকে সম্পদ বের করে আনার জন্য ট্রাম্প তাঁদের ‘সম্পূর্ণ নিরাপত্তার’ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
প্রথাগত বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর মনে হচ্ছে। বৈশ্বিক শাসনের নতুন কাঠামো গড়তে আমাদের ইচ্ছুক দেশগুলোর জোট দরকার। যেসব দেশ টেকসই উন্নয়নের ব্যাপারে সিরিয়াস তাদের এক হতে হবে। ঐকমত্য তৈরির ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ঐচ্ছিক প্রতিশ্রুতির দিন শেষ। এখন প্রযুক্তি হস্তান্তর, সবুজ অর্থায়ন এবং যৌথ উদ্ভাবন কাঠামোর জন্য বাধ্যতামূলক চুক্তি দরকার। মানুষ ও পৃথিবীর কল্যাণে এটিই হবে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর।
মূল্য তৈরির মৌলিক নতুন উপায় ছাড়া ‘সংলাপের চেতনা’ অর্থহীন। সত্যিকারের আদান-প্রদানের জন্য সরকারি-বেসরকারি সম্পর্কের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া জরুরি। দরকার এমন সব চুক্তি যেখানে কঠোর শর্ত থাকবে। ঝুঁকি ও পুরস্কার দুটোই ভাগ করে নিতে হবে। তা না হলে আমরা অতীতের ভুলগুলোই বারবার করতে থাকব। জিউসেপ্পে তোমাসি দি লাম্পেদুসা বলেছিলেন, ‘সবকিছু আগের মতো রাখতে চাইলে সব কিছুকেই বদলাতে হবে।’